মধ্যবিত্ত আবেগের পুনঃপাঠ
মধ্যবিত্ত আবেগের পুনঃপাঠ
সিয়াম আল জাকি
মধ্যবিত্ত প্রবল প্রতাপ এর সাথে বিরাজ করে দেশের সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্পের কেন্দ্রে। অবাক হওয়ার কিছু নাই। মধ্যবিত্তকে আবর্তন করেই এগিয়ে চলে অর্থনৈতিক গতিধারার একটি বড় অংশ। এই অর্থনীতি যে রাজনীতি ও সমাজ গঠনের সামাজিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্ষেত্র এই কথা বলা বাহুল্য। তো এই মধ্যবিত্ত এর ব্যবচ্ছেদ করা অতি প্রয়োজনীয় তাই। মধ্যবিত্ত এর মন গঠনে কোন বিষয় গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তারও একটা চিত্র আকা প্রয়োজন। এই মধ্যবিত্ত এর কাছে নিজের জীবন যাপন সকল কিছুর উপরে। একটা শ্রেণীর এই ক্রমশ সুবিধাজনক অবস্থার নামে সুবিধাবাদী পন্থাকে আঁকড়ে ধরার সচেতন বা অসচেতন প্রয়াসকে আঁতস কাচ এর নীচে পরীক্ষা করার জরুরী অবস্থা তাই শুরু করে দেওয়া উচিত এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।
মধ্য বিত্ত থেকে তার আত্মা ছিনিয়ে নেওয়া প্রয়োজন এমন দাবি করেন কেউ কেউ। মধ্যবিত্ত এর আত্মা কী?
অধিকাংশ এর ধারণা মধ্যবিত্তের আত্মা হলো ' বিত্ত'। এই বিত্তের জন্য মধ্যবিত্ত নিজের আদর্শ নিজের বিশ্বাস এর সাথে যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। মধ্যবিত্ত এমনকি নিজের অধিকার এর সাথেও আপোষ করতে দ্বিধা করে না এই ' বিত্ত ' এর জন্য। প্রশ্ন আসে মধ্যবিত্ত মূলত ' বিত্ত' চায় কীসের জন্য। উত্তর হতে পারে জাগতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে গড়ে উঠা উন্নতির আকাঙ্ক্ষা। সমস্যা হল এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে আদতে কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা আছে এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে লুকায়িত ' যে করেই হোক পেতে হবে ' - এর বাস্তবতার। এই ' যে করেই হোক পেতে হবে ' - এর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটা শ্রেণীর ' সুবিধাবাবাদী' ও ' অসচেতন ' হওয়ার আলাপ।
আলাপ এর সুবিধার জন্য আলাপ আমরা শুরু করবো বাংলার মধ্যযুগ থেকে যখন মুসলিম শাসন চলছে।
এক
বাংলায় মুসলিম শাসনের শুরুতে উচ্চ শ্রেণী তিনটি প্রধান শাখায় বিভক্ত ছিল ১. উলেমা ও ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ২. আহল-ই-কলম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর ব্যক্তিগণ এবং ৩. আহল-ই-তেগ বা উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মচারীগণ।
এই ভাগ চিরকাল থাকেনি সমাজে ক্রমাগত পরিবর্তনের স্রোতের কারণে। এর মধ্যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে।
সম্রাট হুমায়ুন লোকদেরকে তিনটি শাখায় বিভক্ত করেন:
১. আহল - ই - দৌলত, অর্থাৎ শাসক শ্রেণী, রাজ পরিবারের সদস্যগণ, আমির ওমরাহ এবং সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীগণ এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ; ২. আহল - ই - সায়াদাত সাফল্যমণ্ডিত ব্যক্তিগণ বা বুদ্ধি বৃত্তিক শ্রেণী, যার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন উলেমা ( ধর্মশাস্ত্রবিদগণ) , কাজিগণ, সৈয়দগণ এবং পুণ্যাত্মা ও বিদ্বান ব্যক্তিগণ ; ৩. আহল-ই-মুরাদ ( আকাঙ্ক্ষনীয় ব্যক্তিগণ) , এ শ্রেণীর লোকেরা আনন্দের সঞ্চার করতেন এবং সঙ্গীতজ্ঞ গায়ক, গায়িকা, নর্তক, চিত্রক, কলাবিদ প্রভৃতি যাদের আমোদের ভূমিকা ছিল। — ১
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো আদতে বর্তমান শ্রেণীবিভাজন এর ভিত্তিতে উপরোক্ত ভাগগুলো ব্যাখ্যা করা যায় কিনা। দৌলত শ্রেণীকে উচ্চবিত্ত এর কাতারে ফেলে দেওয়া যায়। তবে সব অংশকে না বোধহয়। বর্তমানে কোনোভাবে আমির ও ওমরাহ দের উচ্চবিত্ত বলে ধরে নেওয়া যায় না। অবশ্য যারা ওয়াজ মাহফিলে জনপ্রিয় আর বিভিন্ন উচ্চবিত্ত অঞ্চলের মসজিদে আমির এর ভূমিকা পালন করেন তাদের কথা আলাদা। তাদের বাদ দিলেও একটা বিরাট অংশ আর উচ্চবিত্তের কাতারে অবশ্যই পড়বে না। ওনারা মধ্যবিত্তের সাথে মিলেমিশে একাকার। এর ফলে আরেকটা কাজ হয়েছে তা হলো সাধারণ মানুষের সাথে তাদের যোগাযোগ আরো বেশী স্বাভাবিক সুন্দর হয়েছে। ' বিত্ত' তাদের মাঝে দেয়াল হিসেবে দাড়িয়ে থাকেনি।
তবে কিছু ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা উচিত। অতি সম্মান পাওয়ার আশায় তারা কখনো কখনো মানুষের উপর জুলুম করেন এমন খবর শোনা যায়। তাদের যেহেতু বিত্তের অভাব আর বাজারের অবস্থা যেহেতু করুণ তাই তারা প্রতিনিয়ত অর্থের যোগান দেওয়ার পেছনে নিজেদের ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে বেইমানিও করে থাকেন। লোক ঠকিয়ে বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের অর্থের আকাঙ্খার জোগান দেন। আর বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তের যারা যারা আছেন তারা এক লাফে বড়লোক হওয়ার নেশায় তাদের পাতা ফাঁদ এ পা দেয়। মানে একটা কথা পরিষ্কার মধ্যবিত্তের ভিতর তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতার মধ্যে নতুন মধ্যবিত্তরা একে অন্যের লালসার জন্য একে অন্যকে ঠকাতেও দ্বিধাবোধ করে না।
এর মধ্যেই ঐতিহাসিকগণ মুসলিম আমলের লোকদেরকে দুইটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন : ১. সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণি ও ২. সাধারণ শ্রেণী যার অন্তর্ভুক্ত ছিল মুসলমানও হিন্দু জনগণ। অর্থনৈতিক জীবনের ভিত্তিতে মুরল্যান্ড মুসলমান আমলের লোকদেরকে দুটি ভাগে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন: ১. খাদক শ্রেণী ও ২. উৎপাদক শ্রেণী -২।
ডক্টর এম.এ.রহিম বলেছেন " লোকদেরকে সুবিধাভোগী অভিজাতশ্রেণী ও সাধারণ শ্রেণি এই দুই ভাগে শ্রেণীবদ্ধ করা হলে ভুল করা হবে, কারণ এতে ভারতে মুসলিম শাসনের কয়েক শতাব্দীর সামাজিক জীবনে যে বিবর্তন হয়েছে তা অবহেলা করা হবে। সামরিক, বেসামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদেরকে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে সন্নিবেশিত করা হলে এর অর্থ হবে যে এরা বংশগত উত্তরাধিকার সূত্রে পদমর্যাদা লাভ করেছেন। "
ঐ যুগের ব্যক্তিদের সুবিধাভোগী বলার পেছনে মূল কারণ ছিলো অভিজাত শ্রেণী যার মধ্যে বর্তমানের মধ্যবিত্ত এর অংশে আছে এমন লোক ছিলো তারা শাসকের অনুগত হওয়ার ফলে সুবিধা পেতো বিশেষ। এই সু্বিধা সম্মান আকারে ইঙ্গিতে উপস্থিত। তাদের বাড়তি সম্মানকেই মূলত সুবিধা হিসেবে ধরে ঐতিহাসিকগণ তাদের সুবিধাভোগী বলে চিহ্নিত করছেন। তবে ডক্টর এম এ রহিম বলছেন তাদের সরাসরি সুবিধাভোগী বলা উচিত হবে না। কারণ তারা নিজেদের মেধার পুঁজির সাহায্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাগতিক লাভ আদায় করেছেন।
কেউ যদি নিজের মেধার সাহায্য কোনো কিছু লাভ করে তবে তাকে অবশ্যই সুবিধাভোগী বলা যায় না। কেউ যদি এভাবে ক্রমশ আর্থিক প্রাচুর্য ভোগের দিকেও কেউ যদি নিজের প্রতিবার কারণে এগিয়ে যেতে থাকে তবুও তাকে বলার বা অন্তত তার সমালোচনা করার কিছু নেই। যৌক্তিক কথা। তৎকালীন সুবিধাভোগীর শ্রেণী নিজের যোগ্যতায় সামনে এগিয়ে যেতো এই কথাও মানা গেল। সবচেয়ে বড় কথা তাদের মধ্যে কোন ধরনের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। এই ' উত্তরাধিকার ' ব্যপারটা গুরুত্বপূর্ণ এখানে৷ বর্তমানকে পৃথক করে উপস্থাপন করতে বাধ্য করে এই উত্তরাধিকার সূত্রের ব্যাপারটা। তৎকালীন প্রেক্ষাপটের হিসেবে দেখলে দেখতে পাওয়া যায় পরিবারের কেউ যদি অভিজাত শ্রেণি হিসেবে গণ্য হয় এর মানে এই নয় যে সেই পরিবারের কেউ বিনা যোগ্যতায় অভিজাত কেউ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি এর বিপরীত। উত্তরাধিকার সূত্রে দাদা এমনকি দাদার দাদাও কোন না কোনভাবে বর্তমানে উপস্থিত ব্যক্তির রেফারেন্স হিসাবে কাজ করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সুবিধাভোগী থেকে ক্রমশ সুবিধাবাদী চেতনায় উল্লাস করার পিছনে এর একটা যথার্থ ভূমিকা আছে বলে অনুমান করা যায়।
তবে ডক্টর এম এ রহিম মন্তব্য করেছেন যে " বর্তমান যুগের সমাজেও মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তির বলে অনেকে সরকারি উচ্চপদে উন্নীত হন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্য ভোগ করেন। "
এই কথাকে সম্পূর্ণরূপে দ্বিখন্ডিত করার মতো যুক্তি হয়তো আমাদের হাতে নেই তবে ঘটনা প্রবাহ বলছে সবাই নিজের যোগ্যতা ব্যবহার করার মাধ্যমে উন্নতি লাভ করে না। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ দুর্নীতির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। নিউ নরমাল দুনিয়ার অজুহাতে নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসকে বেঁচে দেওয়ার মাধ্যমে তথাকথিত আধুনিক মানুষ প্রমাণ করতে চায় যে তাদের হাতে আর কোন উপায় নাই। এই যে উপায় নাই বলে নিজেদের নির্দয়ভাবে উপস্থাপন করার একটা নগ্ন ভয়ানক চেষ্টা করার মাধ্যমে কি প্রমাণ করতে চায় তারা? তারা প্রমাণ করতে চায় তারা ঠিক ঐ তৎকালীন যুগের মানুষের মতই সুবিধাভোগী শ্রেণী যে ক্রমশ শাসকের দাস হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যায়। এর পিছনে কাজ করে তার আদি শাসকের আশেপাশে ঘুরঘুর করার সুবিধা প্রাপ্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই আদি আকাঙ্ক্ষা তাকে ক্রমশ ঘুষ নেওয়া ও ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া এবং পরে এই ঘুষের টাকা উঠানোর জন্য আরো বেশি দুর্নীতি করার জন্য প্রলুদ্ধ করে। এই ' তাকে ' ব্যাপারটার মূল কেন্দ্রে বাস করে মধ্যবিত্ত। কেননা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাপার এর একটা বড় অংশ নিজের অবস্থান জানান দেয় মধ্যবিত্তকে একদম কেন্দ্রে রেখে। এবং তা হতে পারে মধ্যবিত্তের অগোচরেও। ভয়ানক কথা ব্যাপারগুলো যাতে নিজেদের গোচর হয় এর জন্য মধ্যবিত্তের কোন মাথা ব্যাথা নেই। মধ্যবিত্ত তথাকথিত সুবিধাভোগী যাকে সুবিধাবাদীও বলা যায় তার কাছেই শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে । অবশ্যই বলা বাহুল্য তার আদি নিদর্শন হিসেবে বা বলা যায় আদি নিদর্শনের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে কাজ করে শাসকের আশেপাশে ঘুরঘুর করা হালকা সুবিধা নেওয়া এবং সুবিধা নেওয়ার পর তা যে যৌক্তিক সুবিধা তা প্রমাণ করে অদ্ভুত এক পুলক লাভের চেষ্টা করা। আজকাল যে বলা হয় মধ্যবিত্ত সরকারি চাকরির উপর বেশি নির্ভর করে। কারণ সে মনে করে এতে বেশি সুবিধা বেশি সম্মান ও এর পেছনে ঠিক এই ব্যাপারটাই বেশি কাজ করে।
তবে সম্রাট হুমায়ূন এর যে লোকদেরকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন তা শুধুমাত্র রাজদরবারের সহিত সংশ্লিষ্ট লোকদের জন্য প্রযোজ্য । এতে সমাজের লোকদেরকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্তি করন বুঝানো হয় নাই। তাই সাম্রাজ্যের অধিকাংশ লোক এই শ্রেণীকরণের বাইরে ছিল।
" হুমায়ূন এই শ্রেণিগুলোর প্রত্যেকটি বারটি ধাপে বিভক্ত করেন এবং গুণাগুণ এর ভিত্তিতে এই ধাপগুলোর প্রত্যেকটি উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন এই তিন শ্রেণীতে স্থাপন করেন ।
আহল-ই-দৌলত, আহল-ই-সায়াদত ও আহল -ই-মুরাদ শ্রেণী তিনটি তীর সূচক বিশেষ মর্যাদার দ্বারা চিহ্নিত ছিল। প্রত্যেক শ্রেণী ও তীর সূচক মর্যাদার প্রধান হিসেবে সম্রাট সর্বোৎকৃষ্ট দ্বাদশ ধাপের খাঁটি স্বর্ণের তীর ধারণ করতেন।
খোন্দমীর তার ' কানুন - ই- হুমায়ূন ' গ্রন্থে লিখেছেন যে , সম্রাট তিনটি শ্রেণীর জন্য তিনটি স্বর্ণ নির্মিত তীর করেন। দৌলতের তীরটি ন্যস্ত করা হয় হিন্দু বেগের উপর যিনি মন্ত্রী, রাজ কর্মচারী ও সামরিক কর্মচারীদের বিষয়াদি তদারক করতেন। মাওলানা ফারগানীকে সায়াদতের তীর প্রদান করা হয়, তিনি বিদ্বান ব্যক্তিদের ও সুয়ুরগাল ( মাদদ -ই -মাশ, লাখেরাজ) এর বিষয় দেখাশোনা করতেন। ' মুরাদের তীর অর্পণ করা হয় আমির ওয়ায়েস মুহম্মদকে, তিনি প্রাসাদরাজি এবং রাজদরবারের শান- শওকত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বহন করতেন। প্রত্যেক শ্রেণীতে প্রত্যেক লোকের মর্যাদা নির্ণীত হতো তার তীরের গুনাগুনের দ্বারা। " - ৩
এখানে এই শ্রেণীগুলোর মধ্যে কোন কোন পেশার লোক ছিল তা একবার দেখা দরকার
আহল - ই- দৌলত এ ছিলো উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন মর্যাদার কর্মচারীরা।
আহল-ই-সায়াদত এ ছিলো সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাবপত্তির অধিকারী শেখ, সৈয়দ ও উলেমা সম্প্রদায়।
আইনজীব, চিকিৎসক, লেখক, কবি প্রভৃতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল এই শ্রেণীর মধ্যে।
আহল-ই-মুরাদ এর মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতজ্ঞ, ভাস্কর, চিত্রকর, গায়িকা ও নর্তকীগণ।
এরা সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তৎকালীন হিসেব মতে দেখা যায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত লেখক, চিকিৎসক, সঙ্গীতজ্ঞ ও শিক্ষকগণ যথেষ্ট মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। সেই সময় যারা গান করতেন তাদের সম্মানিত হিসেবে দেখা হতো এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকেও জনসাধারণ খুব সম্মান প্রদর্শন করত।
মুসলিম আমলে বহু সংখ্যক কবি ও লেখকদের আগমন ঘটে। শিল্প কলার সমাজ ছিল সে যুগে। শাসকবর্গ, অভিজত শ্রেণী ও সম্পদশালী ব্যক্তিগণ স্থাপত্য শিল্পে আগ্রহী ছিলেন। তাদের এই আগ্রহই মূলত যারা শিল্পী সমাজের তাদের সম্মান বজায় রাখার মূল কারণ ছিল। তারমানে একটা কথা স্পষ্ট মধ্যবিত্তের সম্মান কতটা বজায় থাকবে তা নির্ভর করে তার উচ্চ যে শ্রেণী আছে তার মনোভাব মধ্যবিত্তের শ্রেণীর উপর কেমন।
তো এত কিছুর পরও মুসলমান আমলের সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণী দেশের গোটা জনসংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র ছিল। এমনকি বলা যায় তারা সমাজে কিছুটা অসুবিধাজনক অবস্থায় ছিল, কেননা অভিজাত শ্রেণীর লোকদের মত আমোদ ও আড়ম্বরে জীবন যাপন করার সাধ তাদের ছিল, কিন্তু সে অনুপাতে তাদের সম্পদ ছিল না।
তো বলা বাহুল্য তৎকালীন মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজনীতিতে তার প্রবেশের যে কোন সুযোগ আছে বা থাকা উচিত সে সম্পর্কে সচেতন ছিল না। কারণ তৎকালীন ব্যবস্থায় সে অনেকটাই উচ্চশ্রেণী তৎকালীন তাদের কাছে পরাস্থ হিসেবে ছিল। এমনকি তার মান সম্মান ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করত। যা বর্তমানের সাথে তুলনীয়।
সেই ডক্টর রহিম বলেছেন " বর্তমান কালের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকদের ন্যায়, মুসলমান আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সচেতন ছিল না। "
তো তার এই অসচেতনতা শাসক শ্রেণীকে অবশ্যই সুবিধা দিয়ে দেয়।
সবচেয়ে বড় কথা বর্তমানে প্রচলিত মত '' মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক ভাবে সচেতন না " এটা এখন কার কথা না এর ভিত্তি যথেষ্ট পুরনো অন্তত চার বা পাচশো বছরের পুরনো।
দুই
আমরা দেখতে পারছি তৎকালীন লোকদের মধ্যে বর্তমান মধ্যবিত্তের কিছু উপাদান শুধুমাত্র দেখা যাচ্ছে। যেই ছকে তাদের হয়তো সুবিধাবাদী বলা যায় তবে পুরোপুরি যায় না। উল্লেখ্য এই যে কবি ও লেখকগণ জোরালো ভাষায় শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন তখনকার সময়ে এরকম উদাহরণও পাওয়া যায়। " রাজা মানসিংহের সুবাদারির সময় উত্তরবঙ্গে, স্থানীয় কর্মচারী, রাজস্ব দালাল ও রাজস্ব আদাইকারীদের অত্যাচারের কথা বর্ণনা করেছেন কবি মুকুন্দরাম। "
তারমানে পুরোপুরি সবাইকে একসাথে সুবিধাবাদী বলা যায় না।
আমাদের এখন মূল সমস্যা হচ্ছে বর্তমানে যে মধ্যবিত্ত তার উপরে রয়েছে উপনিবেশিক শাসনের একটা চূড়ান্ত বাজে প্রভাব। যেটা শুরু হয় কোম্পানি আমল থেকে।
তো এই নতুন মধ্যবিত্ত যারা কোম্পানি আমলের বা ব্রিটিশ আমলের ফসল তাদের মধ্যেও কেউ কেউ প্রতিবাদ করছেন বটে তবে তাদের সে প্রতিবাদ ডমিনেটিং ডিসকোর্স আকারে খুব বড় হবে প্রকাশ হওয়ার সুযোগ পায়নি। সে ব্যাপারে হয়তো অন্যত্র আলোচনা করা যেতে পারে।
এখন আমাদের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বর্তমান মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদী হওয়ার পথ কিভাবে সুগম হয়েছে তা একবার হয়তো খুব ক্ষুদ্রভাবে বা ক্ষুদ্র পরিসরে খতিয়ে দেখা।
আমাদের শিক্ষা জীবন শুরু হওয়ার একদম শুরুতেই আমাদের একটা মুখস্থ বুলি আউড়ানো হয় " লেখা পড়া করে যে, গাড়ী ঘোড়ায় চড়ে সে "। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ' বাবুর' দলের পুরনো সামন্ততন্ত্রের রেশ না কাটাতে পারার নিদারুণ বাস্তবতার।
আব্দুল মওদুদ তার মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশঃ সংস্কৃতির রুপান্তর বইতে বলেছেন
" এরাই ইংরেজ সরকার আমলের বাবুর দল। কলমপেশায় শারিরীক পরিশ্রম হলেও এরা শিক্ষিত এবং সাধারণ যন্ত্রপাতি নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের চেয়ে সংস্কৃতি - অভিমানী। ইংরেজ সরকারে চাকুরীর সম্মান ও জীবনের নিরাপত্তার নির্দেশ পাওয়া যায় এসব প্রবাদ বাক্যেঃ যেমন- তেমন চাকরি ঘি ভাত ; লেখা পড়া করে যে, গাড়ী ঘোড়ায় চড়ে সে। "
তারমানে বুঝতে পারা যায় আজ চাকরি করা মধ্যবিত্ত শাসন যারা করছে তাদের প্রতি যে ভয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তার মূলে আছে এই ইংরেজ আমলে গড়ে উঠা নতুন মধ্যবিত্ত সিলসিলা। একটা প্রশ্ন প্রায় সবসময় মধ্যবিত্তের তরফ থেকে আসে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বা এককথায় শাসন ব্যবস্থার প্রতিবাদ করলে তো আমাদের চাকুরী চলে যাবে আমরা নে খেয়ে মরবো। এমন মানসিকতার বুৎপত্তিগত পাটাতন ঐ ইংরেজ আমলের নতুন ' মধ্যবিত্ত ' থেকে এসেছে।
চাকুরে বলতে অবশ্যই এখানে সরকারি অফিসে চাকরি করা মানুষ আছে, আইনজীবি, বিচারক, চা-বাগানের ম্যানেজার আছে আবার আছে শাসকদের স্বীকৃত লেখক-কবিগণ, বুদ্ধিজীবি গোষ্ঠী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক ইত্যাদি।
এককথায় বলতে গেলে সমাজে শাসনের দাসত্ব চালু রাখতে যেসব মানুষজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাদের মধ্যে প্রভাবশালী একটা অংশ এই ' সুবিধাবাদী ' নীতিতে বিশ্বাসী। যার দরুন প্রচুর চাকরি লোভ একটা ভূখণ্ডের মানুষের নিজের অধিকার ত্যাগ করার একটা অজুহাত হিসেবে দাড়িয়ে গেছে। এই অজুহাত বাস্তবতা নামে স্বীকৃত।
আঠারো শতকের মধ্যভাগে যে ব্যবসার ক্ষেত্রে যে মধ্যবিত্ত
শ্রেণীর আবির্ভাব হয় তাদের আদি পুরুষরা ছিলো ইংরেজ হৌসে ও ব্যাংকিং কর্মে নিযুক্ত দালাল পর্যায়ের লোকজন। যাদের মূল কাজছিলো ইংরেজের আশেপাশে ঘুরঘুর করা। তারা ভাঙা ইংরেজি বলতো এবং সামান্য পারিশ্রমিক এর বিনিময়ে কাজ করে দিতো ইংরেজ তাদের বেনিয়ান বলে সম্বোধন করতো। এরা দোভাষীর কাজও করতো। —
তথ্যসূত্রঃ ডক্টর ফ্রেয়ার
এককথায় এই শ্রেণীর মূল কাজ ছিলো আজ্ঞাবহ ভূমিকা পালন করা।
উল্লেখ্য বাঙালি হিন্দুরাই মূলত এই চাকরি করা শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতো।
" রামদুলাল দের পুত্র আশুতোষ দে চার্লস কান্টর কোম্পানির রেলি ব্রাদার্সের বেনিয়ান হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন। এভাবে বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের আদি পুরুষ জয়রাম আমিনগিরি করে প্রথমে অন্নসংস্থান করতেন ; তার পৌত্র দ্বারকানাথ প্রথমে নিমকি সাহেবের সেরেস্তাদারী করেছিলেন; কিন্তু পরে প্রিন্স দ্বারিকানাথ ঠাকুর হিসেবে ব্যবসায় ও জমিদারীতে জ্যোতিষ্করূপে গণ্য হতেন। ১৮৩৫ সালের বেঙ্গল ডাইরেক্টরিতে দেখা যায় কলিকাতা- চেম্বার -অব -কমার্সের শাসন পরিষদে তিনিই একমাত্র ভারতীয় সভ্য।
১৮৫৮ সালের বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের ১০৩ জন সভ্যের মাত্র পাঁচজনই ভারতীয় যার একজন পারশী ও চারজন বাঙালী হিন্দু।" ১৮৫৮ সালে সরকারি সেভিং ব্যাংক পরিচালনায় ৩৪ জন কর্মচারীর সকলেই ছিলেন বাঙালি হিন্দু। " -৭
বাঙালি হিন্দুরা ঠিক এভাবেই আরো বেশী শাসকদের স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। কারণ তারা ঠিক শাসকের কর্পোরেট চাকুরীজীবি হয়ে উঠছিল। এর মধ্যে অবশ্য উল্লেখ্য প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রায় নিজের ব্যবসা বুদ্ধির কারণে পশ্চিমা বণিকদের সমকক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।
শাসন কার্য পরিচালনায় হিন্দুদের আরো উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ তুলে ধরার জন্য আরো কিছু তথ্যের আগমন ঘটানো প্রয়োজন। তাহলে বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার হবে।
" ১৮৩৫ সালে কলিকাতা সুপ্রিম কোর্টের পেটি জুরি তালিকাতে ৯৯ জনের নাম ছিল, তার মধ্যে ৯৬ জন ছিল বাঙালি হিন্দু এবং তারাও ছিল ৫৪ জন বেনিয়ান বা সরকার, ২৮ জন মুনশী, ১০ জন জমিদার, ৪ জন কেরানী ও ৩ জন ব্যাংকার। পার্শীরা বোম্বাইয়ে ও ব্রাহ্মণরা মাদ্রাজে এ প্রকার একচ্ছত্র অধিকারী ছিল। " -৮
তারমানে একটা কথা স্পষ্ট যে ইংরেজ আমলে বাংলায় ও ভারতের অন্যান্য অংশে তাদের মনমতো একটা মোটামুটি মানের পেশাজীবী শ্রেণী গড়ে ওঠে। তাদের কাজ ছিল শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ইংরেজের সহযোগিতা করা ও তাদের নৈতিক সমর্থন দেওয়া। তাদের কথা এই যে শাসকরা ভালো রাখছে বলেই তাদের যেকোনো উপায়ে শাসন করার অধিকার আছে। শহুরে এই চাকরিজীবী শ্রেণী ক্রমশ এভাবে শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতা ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। যেহেতু শাসকগোষ্ঠী দ্বারা তারা লাভবান হচ্ছে সেহেতু শাসকদের করা কর্মকান্ডের বিরোধিতা করার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। কারণ তারা দেখছিল তাদের কাজটা তো খুব ভালোভাবেই হচ্ছে তাদের স্বার্থ রক্ষা পাচ্ছে তাই শাসকদের অন্যান্য কাজ নৈতিক দৃষ্টিতে খারাপ তাকে পাত্তা না দিলেও চলবে। মোটাদাগে এইছিলো মানসিকতা। তাই এটাতে অবাক হওয়ার মোটেও কোনো কারণ নাই যেকোন শাসকগোষ্ঠী যদি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারে বা অন্তত চাকরি পেতেই হবে এমন লোভের পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী ব্যবস্থা করে দিতে পারে তবে তার কোন চিন্তা নাই লম্বা সময়ের জন্য। সে অনেক কিছু করে পার পেয়ে যাবে কারণ একটা শিক্ষিত শ্রেণী যা মধ্যবিত্ত তার সামনে মাথা নত হয়ে থাকবে।
এখন আর একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় তাহলো ১৮৮৮ সালে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রতিষ্ঠিত ' ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস 'এর বার্ষিক সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের তৎকালীন চেয়ারম্যান ডেভিড ইয়ুল । ক্রমশ শাসকদের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা এভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে নতুন চিন্তা তারা উৎপাদন করতে পারছে না শাসকদের সহযোগিতা ছাড়া। অদ্ভুত এক অবস্থা।
তিন.
আচ্ছা এই মধ্যবিত্ত আবেগ যে কেবলমাত্র হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা না। এই আবেগ বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যেও ক্রমশু জেকে বসে ছিল। হ্যাঁ অবশ্যই বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ হিন্দু মধ্যবিত্তের অনুরূপ ছিল না পুরো একথা বলাই যায়। আচরণ প্রবৃত্তির মধ্যে যে খুব পার্থক্য ছিল এমনটাও বলা যাচ্ছে না। কারণ তার মধ্যেও ' শিক্ষালোভ ' ও তারফলে ' চাকরির জন্য লোভ ' এর অবস্থান ছিল। যা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। এর জন্য শেরে বাংলা একে ফজলুল হক সম্পর্কিত কিছু কথা বলা উচিত।
" ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হলে তিনি খেলাফত আন্দোলনের মূল প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, খেলাফত আন্দোলনের প্রস্তাবিত কর্মসূচি অনুযায়ী সরকারি স্কুল ও কলেজ বয়কট করা হলে তা মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতির কারণ হবে। লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে জনাব হক মুসলমানদের জন্য স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হন যা ' মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর' হয়। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মুসলমানরা তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতো শ্রদ্ধা করতো... কারণ তিনি তাদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করেন, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেন। " -৯
আবার চাকুরে সম্মান আর শিক্ষার উপর ভর করে একটা রাজনৈতিক ক্ষমতার ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা। এখন ওই প্রশ্ন আসতে পারে যে কাউকে যদি সেই সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে এবং আসলেই যদি তা দেয়া হয় তারপর যদি তাদের থেকে রাজনৈতিক সুবিধে আদায় করা হয় তাহলে সমস্যা কি? এতে তো দুই পক্ষেরই ভালো হয়। এই প্রশ্নের উত্তর এভাবে দেওয়া যায় যে সবসময় এর ফল খুব একটা ভালো হয় না কারণ এমন একটা ব্যবস্থা চালু করার জন্য বা বলা যা চালু রাখার জন্য একজন খুবই সৎ কাজ করছে প্রতিনিয়ত এমন নিষ্ঠাবান নেতার প্রয়োজন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ভুলে-ভালে এক দুজন ব্যতিক্রমের দেখা মিললেও কোন না কোন সময় পুরো প্রক্রিয়া কিছু বাজে লোকের অধিকারে চলে যাবে। সে লোক গুলো যখন শাসক হয়ে উঠবে তখন তারা এই চাকরি পাওয়া আর শিক্ষার প্রতি একটা শ্রেণীর এই আবেগকে নিজেদের বাজে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল যুক্তি হিসেবে হাজির করবে। তারা বলতে চেষ্টা করবে আমরা প্রচুর শিক্ষার ব্যবস্থা করছি আমরা চাকরির ব্যবস্থা করছি এবং চাকরিজীবী একটা শ্রেণি গড়ে তোলে নিজেদের প্রশাসন আরো দক্ষ ভাবে চালু রাখার চেষ্টা করছি। যেটা এখন প্রতিনিয়ত হচ্ছে। তবে এই চিন্তা দীবাস্বপ্নের মতো। কারণ এখানে সেই দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের বুনিয়াদ অনুপস্থিত।
আচ্ছা এখন এই নবগঠিত মুসলিম মধ্যবিত্ত সিলসিলা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার আবদুল মওদুদ এর বই থেকে ধার করে।
সৈয়দ আমির হোসেন নামক পাটনার একজন মুসলমান ১৮৮০ সালে মুসলমানদের শিক্ষা নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে মুসলমানদের শিক্ষার তেমন কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। সরকার এ ব্যপারে উদাসীন। এখানে তিনি ' শিক্ষা ' বলতে বোঝাতে চাচ্ছেন ইংরেজি শিক্ষায় মুসলমানদের কোনো আগ্রহ নাই। মুহসিন ফান্ড এর টাকায় হুগলি, চট্টগ্রাম, রাজশাহীতে যেসব মাদ্রাসা আছে তা থেকে আদতে কোনো লাভ হয় না মুসলিম সমাজের বিকাশে।
প্রশ্ন আসে এখানে ইংরেজি কেন শিখতেই হবে?
উত্তর হলো ইংরেজি তখন শাসকের ভাষা। আরো বলতে গেলে অফিসিয়াল সব কাজ তখন ইংরেজিতে হওয়ার প্রচলন চালু হয়ে গেছে৷ যখন মুসলিম আমল চলছিল তখন এর জায়গায় ছিলো ফারসি ও আরবি বা এর আগে সেন আমলে ছিলো সংস্কৃত। এই পরম্পরায় তখন ইংরেজি ছিল অফিসিয়াল ভাষা। আরো বললে বলা যায় শাসন কার্যের মধ্যে নিজেদের আবশ্যক করে তোলার জন্য ঐ ভাষাটা জানা ছিলো একান্ত জরুরী কাজ। বর্তমান সময়ে যেমন তেমন এককথায়।
তবে সেইসময় সৈয়দ আমির হোসেন এর দাবী গভর্নর দ্বারা মানা হয় নি তাই তার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ইংরেজি শিক্ষিত করার উদ্যোগ সফল হয় নাই। তিনি দাবি করেছিলেন "হুগলি মাদ্রাসা তুলে দেওয়া হোক ও রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের মাদ্রাসার ব্যায় সংকোচ করা হোক। এভাবে মহসীন ফান্ডে যে ৯৩ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত হবে, তার দ্বারা কলকাতা মাদ্রাসা- গৃহে স্বতন্ত্র ডিগ্রি কলেজ খোলা হোক। "
সৈয়দ আমির হোসেন এর ভাবনা ছিলো এরকম যে ইংরেজি শিক্ষায় অগ্রসর না হওয়ার কারণে মুসলিমরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে মুসলিমরা একটা ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তুলতে পারছে না হিন্দুদের মতো। যার কারণে মুসলিমরা নিজেদের অধিকার নিয়েও কথা বলতে পারছে না।
তবে এই মুসলিম মধ্যবিত্ত গঠন হওয়ার পর যে তা রাজনৈতিক দলের ব্যবহার সামগ্রী হিসেবে কাজে লেগেছে তা তো দেখাই গেলো পূর্ববর্তী (৯) উদাহরণে।
তার এই প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ইসলামিয়া কলেজ খোলা হয় তার লক্ষ্য পুরণের মানসে। এবং চল্লিশ বছর পরে ১৯২১ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
একটা কথা পরিষ্কার মধ্যবিত্ত গঠন এর প্রক্রিয়া হিসেবে শাসকের অনুগত হওয়াটা প্রায় কিন্তু বাধ্যতা মূলক। তাই মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে শাসকের অনুগত হওয়া থেকে বের হয়ে আসবে বা বলা যায় অন্তত সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসবে তা বলা কঠিন। কারণ এই অনুগত মানসিকতা মধ্যবিত্ত গঠনের ইতিহাসের সাথেই সম্পর্কিত।
এখন প্রশ্ন আসে বিভিন্ন আন্দোলন যে গড়ে উঠেছিলো তাদের কীভাবে ব্যখ্যা করা যায়?
ইংরেজ মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠন করেছে কথা সত্য। উপকারও হয়েছে তাদেন দ্বারা এ কথাও সত্য। তবে তাদের উপকার এর অংশীদার ছিল শহুরে লোকজন ও মহাজন - জমিদাররা। ভূখণ্ডের একটা বৃহৎ অংশ তাদের তাই মন থেকে গ্রহণ করে নাই। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীতে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাকে সীমাবদ্ধ করে রাখার কারণে ইংরেজ দেশের মানুষের চিত্ত জয় করতে পারে নাই।
মধ্যবিত্তের সাথে ইংরেজের বিরোধ শুরু মূলত ইংরেজ এর অতিরিক্ত নাক উঁচু স্বভাব এর কারণে৷ তাদের প্রতি ইংরেজ কর্মচারীদের দূর্ব্যাবহার প্রথমদিককার মধ্যবিত্ত ও ইংরেজ এর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ঘটায়। এই ফাটলই শেষ অবধি বিভিন্ন আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো ' মধ্যবিত্ত' শ্রেণী তখনই আন্দোলন করে যখন নিজেদের স্বার্থে আঘাত আসে ইংরেজদের তরফ থেকে।
কয়েকটি আন্দোলনের নামের আমরা একটু নজর দি 'সিপাহী বিদ্রোহ', 'ফকির - সন্নাসী বিদ্রোহ', 'সাওতাল বিদ্রোহ'। এই বিদ্রোহ গুলোর সময় মধ্যবিত্তদের মধ্যে কানফাটা নীরবতা ছাড়া অন্যকিছু দেখা যাবে না।
বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তদের আন্দোলনের আরেক নমুনা দেখা যায় যখন ১৮৮২ সালে ইলবার্ট বিল উপস্থাপিত হয় ভারতীয় বিধান সভায় । তার উল্লেখযোগ্য বিধান ছিলো দেশীয় হাকিমরা ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারবে। তখন ইংরেজরা বিরোধীতা করে এই বিলের। ভারতীয় সরকারও নতি স্বীকার করে তাদের বিরোধীতার সামনে। এই নতি স্বীকার হিন্দু মধ্যবিত্ত মেনে না নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের কারণে ১৮৮৩ সালে ন্যাশনাল কনফারেন্স স্থাপিত হয়। এটা পরে ১৮৮৬ সালে কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হয়।
এখন কথা হচ্ছে যদি বিল সফলভাবে চালু হতো তবে এই আন্দোলন হতো? উত্তর না। কারণ তখন মধ্যবিত্ত স্বার্থ রক্ষা পেতো।
চার.
এখন একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার উপরোক্ত সব লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো ' মধ্যবিত্ত প্রবণতা চিহ্নিতকরণ '
এই জন্য তথ্য ও বক্তব্য উপস্থাপন। বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এই শাসক অনুগত প্রবণতা থেকে বের হয়েছে এমন কথা বলা যায় না মোটেও । বরং সুবিধাবাদী অজুহাত আরো দৃঢ় বিশ্বাসে রুপান্তরিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রবণতায় নাকি বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত বাড়ছে। হিসাবে গড়মিল থাকতে পারে তবুও এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন
""২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে মধ্যবিত্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ১১তম। বর্তমানে ওই তালিকার ২৮তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোকে বাদ দিলে আগামী দশকে অন্য জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে মধ্যবিত্ত বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষ তিনে থাকবে বাংলাদেশ। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আওতাভুক্ত। শ্রেণীটির বিকাশের মাধ্যমে দেশের সেবা খাতের চাহিদা ও ভোক্তার সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে সম্প্রসারিত হবে অর্থনীতির ক্ষেত্র। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ডাটা ল্যাবের পরিসংখ্যানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।" -১১
তো এই শ্রেণীর একটা বড় অংশ যখন খুব সহজেই নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থার নামে সুবিধাবাদী অমেরুদণ্ডী প্রাণীতে পরিণত করে ভালো থাকে তখন হতাশ হয়ে যান অনেকে। যা স্বাভাবিক। তবে আমাদের এটাও খেয়াল রাখা দরকার যে এই কালচার তাদের মধ্যে এমনে এমনেই আসে নাই। এর পেছনে আছে একটা শ্রেণীর মারাত্মক ভাবে শাসক অনুগত থাকার ইতিহাস। যা তাকে 'আমি ভালো আছি মানেই দুনিয়া ভালো ' এই নীতিতে অটল বিশ্বাস স্থাপন করতে বাধ্য করেছে।
সমস্যা হচ্ছে এখন শাসকরা তাদের আর সেই সুবিধা দিতে পারছে না। আয় যেহেতু বাড়ছে মানুষের কোনো না কোনো ভাবে তাই মানুষ শিক্ষা ব্যবসায় অংশগ্রহণ করে শিক্ষিত হতে পারছে তবে সেই অনুপাতে কাজের ক্ষেত্র তৈরী না হওয়ায় তারা আর সুবিধা করতে পারছে না। তাই শুরু হয়েছে হা হুতাশ। এই চক্র থেকে বের হওয়ার জন্য তাদের প্রয়োজন উদ্যমী হওয়া। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে তাদের শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যে বিদ্রোহ ব্যপারটা ভোতা পেন্সিলের মতো হয়ে আছে। এটাতে ধার একদমই নাই। এমনকী ক্যারিয়ার আর জীবনের জন্য সে নিজের অনেককিছু বিসর্জনও দিতে পারে।
এটার সাহিত্যিক উদাহরণ হিসেবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর চিলেকোঠার সেপাই এর একটা অংশের বর্ণনা দেওয়া যায়। আমরা জানি চিলেকোঠার সেপাই আইয়ুব খান এর শাসনামলের সময়কার গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে লেখা একটা উপন্যাস। তবে সেখানের এই ঘটনা ' মধ্যবিত্ত আবেগ/ প্রবণতা' বোঝার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
" 'প্লীজ স্যর! প্লীজ বি কাইন্ড এ্যান্ড মার্সিফুল স্যর। আমি একজন সেকশন অফিসার স্যার, মিনিস্ট্রি অফ হোম, গভর্মেন্ট অফ ইস্ট পাকিস্তান। আপনারা কাল সেক্রেটারিটে আসেন, কাল তো ছুটি, বুধবার আসেন, আমি গেটে পাস পাঠিয়ে দেবো, ডবল প্রটেক্টেড এরিয়ার গোলাপি রঙের পাস স্যর। আপনাদের কোন সার্ভিসে আসতে পারলে স্যর —।'
তার কথা শেষ হতে না হতেই ছুরিধারী বলে, ' আপনি সেকশন অফিসার? আমি আপনার মিনিস্ট্রির জয়েন্ট সেক্রেটারি। ' আর দুজনকে দেখিয়ে সে বলে, ' ঐ যে আপনার সেক্রেটারি, আর উনি আপনার চীফ সেক্রেটারি। ' নীলডাউন অবস্থাতেই সেকশন অফিসার তিনজনের দিকে তাকিয়ে হাত তুলে ৩বার ' স্লামালেকুম স্যর ' বলে।
ড্যাগারধারী বলে, ' জাস্ট এ সেকশন অফিসার! প্রমোশন পাওয়ার জন্য বৌকে বসের বেডরুমে পাশ করবি না? এখন থেকে প্র্যাকটিস কর! ' রিভলভারধারি তাদের আস্তে আস্তে করে ধমক দেয়, ' মিসবিহেভ করো কেন? গো এ্যাহেড! ' তারপর সেকশন অফিসারকে আশ্বাস দেয়, ' নাথিং টু ওরি এ্যাবাউট। আমাদের ম্যাক্সিমাম এক ঘন্টা। কুইক মেরে দেবো। '
মেয়েটিকে পাজাকোলা করে তুলে ৩ জনের তরুণসমাজ উল্টোদিকের ফুটপাতে চলে যায়। ফুটপাত ধরে একটু এগিয়ে রেসকোর্সের কাঠের রেলিংঙ ডিঙিয়ে ফের সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। কুয়াশায় তাদের আর দ্যাখা যায় না।
তরুণ আরোহীর সেই নীলডাউন অবস্থা তখনো কাটেনি। খিজির বলে, ' চলেন স্যর, থানায় যাই গিয়া। নীলখেত ফাঁড়ি তো কাছেই। '
লোকটি ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। খিজির ফের বলে, ' চলেন যাই! '
লোকটি তখন রাস্তায় ধপাস করে বসে পড়ে। দুই হাতে মুখ ঢেকে সে কাঁদতে শুরু করে। তার কানের কাছে মুখ রেখে যতোটা সম্ভব নরম করে খিজির বলে ,' চলেন যাই। অখনও টাইম আছে। থানায় চলেন! চলেন! '
কান্নায় সাময়িক বিরতি দিয়ে লোকটি ফোঁপাতে ফোঁপাতে জবাব দেয়, ' এদের চেনো? এরা সব এনএসএফের গুন্ডা। আইয়ুব খানের বাস্টার্ড মোনেম খান, মোনেম খানের বাস্টার্ড এরা! '
খিজিড় তাড়া দেয়, ' লন যাই! ইউনিভারসিটির এতো গুলি হল এহানে! পোলাপানেরে খবর দিই। চলেন সাব!'
লোকটির ফোঁপানো কণ্ঠস্বর ফের গুমরে ওঠে, ' না। তা হয় না। আরো বিপদ হবে। ওরা এক ঘন্টা ওয়েট করতে বলল না? এসে আমাকে না পেলে ফায়ার হয়ে যাবে! চাকরি-বাকরির কথা সব বলে ফেললাম, শুয়োরের বাচ্চারা আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেবে! '
লোকটি ফের হাতে মুখ গুঁজে ফোঁপায়, ' এরা ডেঞ্জারাস, মোস্ট পাওয়ারফুল!' ফের নতুন উদ্যমে কাঁদবার প্রস্তুতি নিলে নিজের স্কুটারে ফিরে আসা ছাড়া খিজিরের কোন কাজ থাকেনা। ' তুমি আমাকে একা রেখে চলে যেও না ভাই! '— লোকটির এই মিনতির জবাবে সে বলে, ' অরা আপনাগো গাড়ি কইরা পৌঁছাইয়া দিবো! ' ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে এক্সেলেটর থেকে হাত উঠিয়ে খিজির ফের রাস্তায় নামে, ' সায়েব, ভাড়াটা? '
' ভাড়া? ' তরুণ রাজকর্মচারী হাত থেকে মুখ তুলে অশ্রুসজল চোখে তার দিকে তাকায়।
' মিটার দেইখা ভাড়াটা দিয়া ফালান? '
প্রচন্ড রকম বিস্ময় ও মর্মাঘাতে লোকটির মুখের খুচরা- খাচরা পার্টস ওলট - পালট হওয়ার উপক্রম ঘটে। পকেট থেকে টাকা বের করে ভিজে গলায় সে বলে, ' তোমরা মানুষ না! মানুষ হলে এ সময় কেউ —।'
স্কুটার রাস্তায় গড়িয়ে দিলে খিজির তার উক্তিকে স্বীকার করে চিৎকার করে, ' না। আমরা কুত্তার বাচ্চা, মানুষ হলেন আপনারা!' " – ১২।
এখানে ঐ সেকশন অফিসার হলো আদতে আমাদের প্রিয়
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অধিকাংশের পরাজিত নমুনার একটা চিহ্ন। তার সামনে সুযোগ ছিল ইউনিভার্সিটি এর হল গুলোতে যাওয়ার বা নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়িতে যাওয়ার। কিন্তু না যাওয়া হয় নাই। এর কারণ কি? এর কারণ হিসেবে আছে তার ক্যারিয়ারের প্রশ্ন বা চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে যাবে এই চিন্তা। আমরা যে এতক্ষণ ধরে বলে আসছি এই শাসকের পদলেহন করার জন্য উন্মুখ থাকার বন্দোবস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণী কে ক্রমশ ভীতু আর যেকোনো ধরনের আন্দোলন বা বিপ্লবের শত্রু হিসেবে গড়ে তুলেছে তার একটা মারাত্মক সুনিপুণ সাহিত্যিক নিদর্শন হলেন এই সেকশন অফিসার। তিনি নিজের ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা চান কোন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে। তিনি মনে করেন লোকে কিছু জানবে না এখানেই তার সম্মান লুকায় আছে। এবং এই সম্মানই তাকে বড় করে তুলবে।
তিনি শুধু কতক্ষণ পরপর ফুঁপে ওঠেন! আবেগে থর থর করেন! এবং তার মাধ্যমে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন! কিন্তু প্রতিরোধ এর দিকে তার মন আগাতে সাহস করে না। তারা মন দিয়ে সাহস করে না পেছনের লুকায়িত আছে ' মধ্যবিত্তের ' অরাজনৈতিক ও সুবিধাবাদী বর্গ থেকে বের না হওয়ার কারণ। যার ঐতিহাসিক বাস্তব ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হয়েছে ক্ষুদ্র পরিসরে।
খিজিরকে অপরদিকে দেখা যায় যথেষ্ট সাহসের প্রতিক আকারে। ঐ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সেকশন অফিসার থেকে তার বাস্তব জ্ঞান ও বাস্তব সাহস যে বেশি তা উপলব্ধি করা যায়। ঐ অফিসার কে বারবার খিজির বলছে চলেন যাই কিছু একটা করি। তার মনে কোন ভয় নেই লোকে কি বলবে সেগুলোর পরোয়াও করে না। কারণ সে ঐ একটা কথা জানে এবং বুঝে যারা কিছু বলবে তারা আদতে খুব একটা সাধু মানুষ না। তাদেরও দোষ আছে। তাই তাদেরকে সেই বিচারকের ভূমিকায় কল্পনাও করা উচিত না। এই ক্ষুদ্র বিষয়টা আমাদের ওই 'শিক্ষিত সেকশন অফিসার ' বুঝেন না। তাই সেকশন অফিসার ঐ মানসিক বর্গ থেকেও বের হয়ে আসতে পারে না।
পাঁচ.
তবে সৈয়দ শামসুল হকের গল্পে শিল্পি খানম তৎকালীন মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক প্রতিরোধের চিত্র দেখতে পাচ্ছেন এবং তা তুলে এনেছেন।
তিনি বলছেন সৈয়দ শামসুল হকের সম্রাট গল্পের কথা। ( আরো কিছু গল্পের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন)
যেখানে দেখা যাচ্ছে আইয়ুব খানের শাসনামলের প্রথম দিকের ছাত্র আন্দোলনের বিষয়বস্তু। সেখানে রেলের এক কর্মচারী বাবা জহির নিজের সন্তানকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। তবে উনার সন্তান শাহেদ স্বাভাবিকভাবেই বাবার কথা শোনেন না। - ১৩
এখানে লক্ষণীয় বিষয়বস্তু হচ্ছে শাহেদকে আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে বিচার করতে পারি বটে। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারটির মূল চালনাকারী হিসেবে তাকে আমরা হিসেবে ধরতে পারি না। এখানে আমরা আলাপের মূল কেন্দ্রে জহির সাহেবকেই রাখবো,বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দেখার জন্য। যেখানে দেখা যায় বর্তমান পরিবার কাঠামোর মধ্যে একজন সদস্য আন্দোলন বা যে কোন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছে কিন্তু পরিবার কাঠামোর যে মুখ্য চরিত্র তিনি আবার এইসবে জড়াতে চান না। তিনি চাকরি করেন সরকারি। সুতারা এই চাকরি দাতার বিরুদ্ধে কিছু করার তার সাহস এবং উপায় নাই। তাই বলা যায় প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদ যাদের তরফ থেকে আসছে বা এসেছে আগে তাদের আন্দোলনকারী মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করা যায় বটে তবে সেই আন্দোলনকারীর নিজ পরিবারের মধ্যেই যে মধ্যবিত্ত চালনাকারী মুখ্য চরিত্র আছে তাকে আবার " প্রতিরোধে মধ্যবিত্ত " এই শিরোনামে আনা যায় না। যা আমাদের আবার জটিল অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয় ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের মধ্যবিত্তের একটা ক্ষুদ্র পাঠ দেওয়া দরকার। এখানে উল্লেখ করা ভালো অর্থনৈতিক দিক থেকে বর্তমান মধ্যবিত্তের আকার ও প্রকৃতির ব্যবধান এসেছে। কিছু তথ্যের মতে মধ্যবিত্তের আকার বড় হচ্ছে আবার কিছু তথ্যের মতে মধ্যবিত্ত ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ চলে যাচ্ছে নিম্নবিত্তের কাতারে, কেউ আবার পৌছে গেছে কোটিপতি মধ্যবিত্তের শিখরে। তাই প্রসঙ্গতই উল্লেখ করা ভালো এই লেখার মূল আগ্রহের কেন্দ্রে আছে যারা ভাব প্রবনতায় মধ্যবিত্ত। এখানে বুদ্ধিজীবী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা উদ্ধৃত করলে ভালো হবে - " মধ্যবিত্ত হিসেবে আসলে যাদের চিহ্নিত করা হয় , তারা আসলে বিত্তের দিক থেকে মধ্য না হলেও চিত্তের দিক থেকে মধ্য। সে কারণে তাদেরকে মধ্যবিত্ত না বলে মধ্যচিত্তই বলা উচিত । " -১৪
অর্থনৈতিক তথ্য উপাত্ত দিয়ে অবশ্যই প্রমাণ করে দেয়া যায় কে মধ্যবিত্ত আর কে মধ্যবিত্ত না কিন্তু সেই তথ্য উপাত্তের কারণে ওই আবেগ যার জন্য অধিকাংশ মানুষ নিজেকে মধ্যবিত্ত দাবি করে সেটার আর কোন হদিস পাওয়া যায় না। তথ্য উপাত্ত তো আর আবেগ ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না।
মধ্যবিত্তের পেশা সংক্রান্ত
জরিপের একটা চিত্র তুলে ধরা যাক।
"১৯৭২ সালে ঢাকা শহরের ৯৪ টি মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে ৮২ টি পরিবারই শুধুমাত্র চাকরির উপর নির্ভর করতেন, ১৯৮৫ সালের চাকরির উপর নির্ভর করেন ৩০টি পরিবার। চাকুরেদের অধিকাংশের আয় এবং ব্যায়ের অসংগতি দেখে অনুমান করা যায় যে, তাদের আয়ের আরো উৎস আছে যেগুলো তারা প্রকাশ করতে চান না। ১৯৭২ সালের শূন্য হলেও ১৯৮৫ সালে মোট ২৬ টি পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস ব্যবসা। ১৯৭২ সালে দুটি পরিবারের আয়ের উৎস ছিল স্কুল শিক্ষকতা, এখন আর তা নেই। এখন এই দুটি পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে গৃহ শিক্ষকতা। -১৫
সুতরাং দেখা যাচ্ছে পেশা ও আয়ের উৎস বিবেচনায় আমাদের দেশে মধ্যবিত্তের রূপ বদলেছে এবং তার সাথে সাথে আয়ের পরিধিও বেড়েছে। কিন্তু আয়ের উৎস ঠিকঠাক ভাবে প্রকাশ হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এখন একটা উদাহরণ দি ধরা যাক একজন অবৈধ উপায়ে টাকা আয় করছেন। সেই আয় দিয়ে পরিবারও চালাচ্ছেন। একটা সময় দেশের আইন ব্যবস্থা তার এই টাকা কামানোর রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখন তাকে অবশ্যই কি করতে হবে? এই আইন যারা পরিচালনা করেন তাদের নিজের আয়ের ভাগ দিতে হবে। তিনি দেন এবং তার সামনে পথের কাঁটা চলে যায়।
স্বাধীনতা পরবর্তী গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত পরিবার চালনার অজুহাতে এই কাজটাই করেছেন। তাই তার সামনে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মত মোরালি স্ট্রং পয়েন্ট আর নাই। কারণ মনে মনে সে জানে যা কিছু হচ্ছে সেখানে তার আচার প্রকৃতির একটা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রীতি জড়িয়ে আছে। তার গড়ে ওঠার সংস্কৃতির মধ্যেই যার দেখা পাওয়া যায়। তাই তার থেকে আন্দোলন প্রত্যাশা করা কিছুটা বোকামি। কারণ যেসব কারণে আন্দোলন করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে সেসব কারণে তার অবদান আছে!
এবার আরেকটু বর্তমানের দিকে নজর ফেরানো যাক। কোভিড পরবর্তী সময় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে কোভিড মানুষের আয় ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
" প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১ সালে কোরবানি যোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫ টি। তার মধ্যে কোরবানি হয়েছে মোট ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২ টি পশু। অধিদপ্তরের তথ্য ঘেটে দেখা যায়, পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পশু কোরবানি হয়েছে ২০২১ সালে।
২০১৯ সালে ছাগল /ভেড়া কোরবানি হয়েছিলো ৪৯ লাখ ১ হাজার ১৮৮ টি আর ২০২১ সালে ছাগল / ভেড়া কোরবানি হয়েছে ৫০ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৮ টি।
" -১৬
এখানে কোভিড পরবর্তী সময়ে মানুষের যে আয় ক্ষমতা কমেছে তার একটা ক্ষুদ্র প্রদর্শন দেখানো হয়েছে। এই যে এতগুলো মানুষের আয় কমে গেলো কি মনে হচ্ছে এটা কি তাকে আরো নতুন নতুন উপায়ে বেশি টাকা আয়ের দিকে নিয়ে যাবে না? অবশ্যই যাবে। এমনকি প্রকৃতিক নিয়মেও নিয়ে যাওয়ার কথা বেশি আয়ের উৎস সন্ধানের দিকে। এবং কোভিড পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলনে যে মানুষকে একত্রিত করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো তখন মানুষের মনে কি চলছিল আসলে? বেশি আয়ের দিকে ঝুকে যাওয়ার প্রস্তুতি নাকি নির্বাচন বিষয়ক আন্দোলন? দুই-ই চলতে পারে। কিন্তু নিজের পকেট বাদ দিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন মানুষ করেছে কি খুব বেশি করে যাতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই বদলে যায়? না করে নাই। যার উদাহরণ গেল নির্বাচন। তাই স্বাভাবিকভাবেই " মন গঠনে " যে মধ্যবিত্তের " আন্দোলন নাই " তার উপর " আয়ের সংকোচন বা বিয়োজন " এর যোগ আছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে গত ২০-৩০ বছর ধরে দারিদ্র্যের হার দ্রুতই কমেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকার বেড়েছে, কমেনি। তবে পিপিআরসির গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কভিডের কারণে দরিদ্রতা কিছুটা আবার বেড়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্তরা কিছুটা দারিদ্র্যসীমায় চলে গেছে। তবে মোটা দাগে মধ্যবিত্তের আকার বেড়েছে। বিবিএসের জীবনযাত্রার মানের বস্তুগত সূচকের দিকে তাকাই, যেমন বাড়িঘর, সেখানে বিদ্যুৎ, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন আছে কিনা; এগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায় মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। আর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকে যদি তাকাই, নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একধরনের সামাজিক মানসম্মান বোধ তৈরি হয়েছে । সরকারি সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার বাইরে থাকা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবস্থা এমন যে তারা কারো কাছে হাতও পাততে পারে না। নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় মূল্যস্ফীতি।
তিনি আরো বলেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রাজনৈতিক ভূমিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গরিবরা জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ব্যস্ত। তাদের তুলনায় নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে ওপরের শ্রেণী অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে পারে। এজন্য একটি তত্ত্ব আছে, যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকার না বাড়া পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় হয় না। আজ যে মধ্যবিত্তের কথা আলোচনা হচ্ছে, তারা জ্ঞানমনষ্ক, মননশীল, সংস্কৃতিবান ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষের মধ্যেই একটা গোষ্ঠী; যারা সমাজে মতামত তৈরিতে ও উন্নত মনমানসিকতাসম্পন্ন নৈতিক সমাজ গঠনে অবদান রাখতে এবং নেতৃত্ব দিতে পারেন। এ বুদ্ধিবৃত্তিক মধ্যবিত্তকে কী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে নাকি দুর্বল হয়ে গেছে—এটা গুরুতর প্রশ্ন। এ বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি অনুপস্থিত থাকলে শুধু বস্তুগত অর্থে উন্নয়ন হলে উন্নতমানের সমাজ তৈরি হবে না।
এ ধারণার কারণ সম্পর্কে তার বক্তব্য হলো, যদি মনে করি বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীলতার চর্চা আসলেই দুর্বল হয়ে গেছে; এর সম্ভাব্য কারণ, প্রথমত শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানের অবনতি, দ্বিতীয়ত শিক্ষিত শ্রেণীর বহির্মুখিতা, তৃতীয়ত শিক্ষা ছাড়া অন্যান্য পথে বিত্তবান হওয়ার পথ খুলে যাওয়া। এমনকি নিম্নবিত্ত থেকে সরাসরি উচ্চবিত্তে চলে যাওয়ার সুযোগও। চতুর্থত, পেশাগত ও সরকারি পর্যায়ে পদায়নের ক্ষেত্রে মেধার অবমূল্যায়ন। অমর্ত্য সেন ভারতের ক্ষেত্রে বলেছেন, পাবলিক রিজন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্র সেখানে আছে, কিন্তু বঞ্চিত জনগণ আছে, বৈষম্যও আছেএসব কমাতে হল পাবলিক রিজনিং দরকার। এটা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার মাধ্যমে
করতে হবে।-১৭
মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়ে কথা কম হয়। মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি আসলে কি নির্ভর তাহলে পরিষ্কার নয় এখনো। অবশ্যই সংস্কৃতির একটা গ্রুপ আছে। কেউ কেউ মধ্যবিত্তের মধ্যে ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাব বেশি দেখতে চায় কেউ কেউ দেখতে চায় আঞ্চলিক সংস্কৃতির প্রভাব আবার কেউ কেউ দেখতে চায় মিশ্র সংস্কৃতির রূপ। এখান থেকে আসলে পাওয়ার কিছু নেই আর। তবুও এই লেখাটা দেখা যেতে পারে ক্ষুদ্র লেখা।
"বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রায় পুরোটারই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ মিত্র শক্তি হচ্ছে আওয়ামী লীগ। তার একটা বড় কারণ, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন মূলত যে সকল এজেন্ডা নিয়ে কাজ করেছে, তার মধ্যে ফিরে ফিরে অন্যতম প্রধান ইস্যু বানানো হয়েছে ‘মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা’র বিরুদ্ধে লড়াইকে। ফলে সে লড়াই করতে যেয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি’র পাশে থাকা তার আদর্শিক দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। মুশকিল হচ্ছে এই ‘মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার’ কিংবা ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি’র বয়ান মূলত তৈরি হয়েছে সেই সকল বুদ্ধিজীবীর দ্বারা, যাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্বার্থ, সুবিধা ভোগের শিকড় বহু আগে থেকেই আওয়ামী লীগের জমিনে বিস্মৃত হয়ে আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে তারা বরাবরই আদর আপ্যায়নে থাকেন। এবং তাদের অনেকেই একসময় বড় বড় সাংস্কৃতিক ‘ফিগার’ ছিলেন। ফলে সারাদেশেই তাদের প্রভাব ছিলো। এখন তাদের ব্যক্তি প্রভাব কমে গেলেও, সারাদেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক সংগঠন ও তার কর্মীদের মধ্যে আওয়ামী ভাবাদর্শে ‘মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার’ বয়ানের প্রভাব এখনো চলমান। অর্থাৎ আওয়ামী ভাবাদর্শ যেটাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলবে, তার বাইরে আর কারো কোনো বয়ান গ্রহণযোগ্য নয়। আওয়ামী ভাবাদর্শ যাকে ‘মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা’ বলে চিহ্নিত করবে সেটাকেই ‘মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা’র প্রতীক হিসেবে মেনে নিতে হবে। এমনকি আমরা চিত্রশিল্পীরা রাজাকারের চিত্রায়ণ করেছি, টুপি-দাড়ি পরিহিত রক্তাক্ত দাঁত বের করা একটা মুখচ্ছবি। টুপি-দাড়িটা যেন মৌলবাদেরই প্রতীক! তাই না? পাশাপাশি সমাজের ‘মর্ডান’রাও মৌলবাদের এই বয়ানকে গ্রহণ করেছেন। কেননা নয়া ঔপনিবেশিক শিক্ষা কাঠামোতে আমরা যত মর্ডান হয়েছি, ততই জনসংস্কৃতি, সাধারণের ধর্মচিন্তা, তার সামাজিক সম্পর্কশাস্ত্র পাঠ করতে ব্যর্থ হয়েছি। দিনে দিনে সাধারণের ধর্ম বিশ্বাস, যাপিত জীবনের সাথে ‘মর্ডান লাইফ স্টাইল’ সাংর্ঘষিক, অপর হয়ে উঠেছে। প্রগতিশীল বনাম মৌলবাদী বাইনারি রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে এই মর্ডানদেরও মিত্রশক্তি হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ।
মধ্য বিত্তের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কী শুকিয়ে মরবে?-১৮
মধ্যবিত্ত আদতে এই লেখায় যতটা না অর্থনৈতিক কারণে মধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তার থেকেও বেশি হয়েছে প্রবণতা ও আবেগের দিক থেকে। এই আবেগের মূলে আছে ঐ সকল প্রশ্নের উত্তর যেগুলো আজকাল ঘুরে বেড়ায় নিউ মিডিয়া থেকে প্রিন্ট মিডিয়া সব জায়গায়। মানুষ বারবার প্রশ্ন করে ' মধ্যবিত্ত কেন এমন? মধ্যবিত্ত কেন বিদ্রোহ করে না? মধ্যবিত্ত কেন রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে পারছে না? মধ্যবিত্ত কেন ধুকছে? মধ্যবিত্তের করুণ অবস্থা কেন? মধ্যবিত্ত আসলে কি চায়? মধ্যবিত্ত নিজের লাইফ স্টাইল এর সাথে আপোষ করে না কেন? "
এ সকল প্রশ্নের প্রায় একটাই উত্তর সে জানেনা এসব আসলে কিভাবে হয়। এটা তার কালচারের মধ্যেই নাই। সে মনে করো না এসব আদৌ দরকারী কিছু। তাই তার দ্বারা যদি কিছু করাতে হয় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাকে তার স্বার্থের লোভ দেখাতে হবে। যেটা তাকে প্রতিনিয়ত দেখায় এবং দেখিয়েছে আগের ও বর্তমানের শাসক গোষ্ঠী। এই লোভের মধ্যে চাকরি আছে, এই লোভের মধ্যে শিক্ষা আছে, এই লোভের মধ্যে আধুনিকতা আছে, এই লোভের মধ্যে শহর কেন্দ্রিক নাগরিক বাস্তবতা আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা এই লোভের মধ্যে একটা আত্মকেন্দ্রিকতার ব্যাপার আছে যাকে সে শান্তি মনে করে এক কথায় 'সুইট হোম '।
এ ব্যাপারগুলো ধরতে পারার জন্য মধ্যবিত্ত উৎপত্তি ও তার বিকাশ কিভাবে তার মন গঠনে সাহায্য করেছে তা জানতে হবে। তা জানার জন্য মধ্যবিত্তের উৎপত্তি নিয়ে যত বেশি পারা যায় চর্চা করা উচিত। এবং সেই ভিত্তিতেই এই একটা শ্রেণীকে নতুন কোন আবেগের ভিত্তিতে গড়ে তোলা যায় কিনা তার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রশ্নের উত্তর আদতে সেখানেই লুকায়ে আছে। বলা যায় চেষ্টার মধ্যেই আছে উত্তর।
তথ্যসূত্রঃ
১. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ২য় খন্ড ( ১৫৭৬ - ১৭৫৭) ডক্টর এম.এ. রহিম পৃষ্ঠাঃ ১৬০–১৬১;
ঈশ্বরী প্রসাদ লাইফ এন্ড টাইমস অব হুমায়ূন পৃষ্ঠাঃ ৫২।
২. প্রাগুক্ত / ডব্লিউ এইচ মুরল্যান্ড - ইন্ডিয়া এ্যাট দি ডেথ অব আকবর পৃষ্ঠাঃ ২৫।
৩. প্রাগুক্ত।
৪. বাহারিস্তান ১ম খন্ড পৃষ্ঠাঃ ১৩৮।
৫. মুকুন্দরাম ওপি, সিট, পৃষ্ঠাঃ ২৯- ৩০।
৬. মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ সাংস্কৃতিক রুপান্তর ( আব্দুল মওদুদ পৃষ্ঠা ৬৮)।
৭. প্রাগুক্ত / The Indian Middle class page 103-107।
৮. প্রাগুক্ত / Bengal Directory, 1854 page 470-481।
৯. বাঙলা ভাগ হল, জয়া চ্যাটার্জী পৃঃ ৮০, ইউপিএল, ঢাকা। / কাজী আহমদ কামাল পলিটিসিয়ানস এন্ড ইনসাইড স্টোরিজ, এ গ্লিম্পস মেইনলি ইনটু দি লাইভস অব ফজলুর হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এন্ড মওলানা ভাসানী, ঢাকা, ১৯৭০,পৃ. ১।
১০. মধ্যবিত্ত সমজের বিকাশঃ সাংস্কৃতিক রুপান্তর, আবদুল মওদুদ পৃ. ৩০৬।
১১. বাংলাদেশের মধ্য বিত্তের আকার এক দশকে পাঁচ কোটি ছাড়াবেঃ সাইদ শাহীন
সেপ্টেম্বর, ৫,২০২১
বণিক বার্তা।
১২. চিলেকোঠার সেপাইঃ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, পৃষ্ঠাঃ ৫৭-৫৮, ইউপিএল ঢাকা।
১৩. সৈয়দ শামসুল হকের গল্পঃ নাগরিক মধ্যবিত্তের স্বরূপ অন্বেষণ, শিল্পী খানমঃ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল অব আর্টস, ভলিউম-১১,সংখ্যা-১, জানুয়ারি – জুন ২০২১।
১৪. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘ বাঙালি মধ্যবিত্ত’, বিচিত্রা, আগস্ট, ১৯৭৮।
১৫. বাংলাদেশের কোটিপতি মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকঃ আনু মুহাম্মদ, পৃষ্ঠাঃ৪১, বাঙ্গালা গবেষণা প্রকাশনা।
১৬. অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবনীয় কথামালাঃ ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, পৃষ্ঠাঃ ১০৩ আদর্শ প্রকাশনী।
১৭. বণিক বার্তা- মঙ্গলবার। এপ্রিল ০৯, ২০২৪।
১৮. বণিক বার্তা -অমল আকাশ ডিসেম্বর০১, ২০২৩।


